Dhaka ০৪:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষার সংকট নকলে নয়

  • Syed Enamul Huq
  • আপডেট এর সময় : ০১:১৮:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬
  • 1

--জুবায়ের আল মাহমুদ।

অনলাইন ডেস্ক:

আসন্ন এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নকল রুখতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ‘হেলিকপ্টার অভিযান’ ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি শিক্ষাঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মন্ত্রীর এই পুরনো স্টাইলে ফিরে যাওয়া শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মনে একটি বাড়তি সতর্কবার্তা দেবে— এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য ২০২৬ সালের বাংলাদেশে শিক্ষার সংকট কেবল ‘নকল’ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা আজ লক্ষ্যহীনতা, গবেষণার অভাব এবং লাগামহীন বাণিজ্যিকীকরণের এক চক্রে বন্দি।

প্রযুক্তির যুগে সংকটের রূপান্তর 

এক সময় পরীক্ষার হলে বই নিয়ে ঢোকা বা দেখে লেখার একটা চল ছিল এটা সত্য। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ নকলের কথা কেউ চিন্তাও করতে পারে না। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের প্রথম মেয়াদের কার্যকরী পদক্ষেপের কারণেই দেশ আজ নকলমুক্ত হয়েছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা নকল নয়। বিগত এক দশকে আমরা দেখেছি, প্রযুক্তির অপব্যবহারে ‘নকল’ শব্দটির সংজ্ঞা বদলে গেছে।

তবে এটা অবশ্যই বলতে হয়, যে, মন্ত্রীর এই ‘অ্যাকশন’ মুড শিক্ষা প্রশাসনের ঝিমিয়ে পড়া কর্মকর্তা এবং কেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের মনে একটি ভীতি ও সাবধানতা তৈরি করবে। শিক্ষার্থীরা অন্তত পড়ার টেবিলে ফেরার একটা তাগিদ অনুভব করবে— যা বর্তমানের মোবাইল আসক্তি ও মাদকের ভয়াল থাবা থেকে তাদের ফেরাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তাই এবারের আসন্ন এসএসসি পরীক্ষায় শিক্ষামন্ত্রীর ‘হেলিকপ্টার অভিযান’-এর সিদ্ধান্তকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে চাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল কেন্দ্র পাহারা দিয়ে কি একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা রক্ষা করা সম্ভব?- এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে জানতে হবে আমাদের মূল সংকট এবং বৈশ্বিক বাস্তবতা।উদার মূল্যায়নের বিষবৃক্ষে মেধার অবমূল্যায়ন 

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গভীর ক্ষতটি তৈরি হয়েছে গত দেড় দশকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশে’ পাশের হার ও জিপিএ-৫ বাড়ানোর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে।

বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, রাষ্ট্রীয় সাফল্যের কৃত্রিম পরিসংখ্যান দেখাতে অঘোষিত নির্দেশে শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো ‘উদারভাবে’ খাতা দেখার জন্য। এর ফলে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত ‘গ্রেস কালচার’। ২৩ পাওয়া শিক্ষার্থীকে ৩৩ দিয়ে পাশ করানো বা ৭২ পাওয়া শিক্ষার্থীকে গ্রেস নম্বর দিয়ে ৮০ বানিয়ে জিপিএ-৫ দেওয়ার এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু হয়েছিল; যা দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। এমনকি আমরা কোনো কোনো শিক্ষাবোর্ডে দেখেছি ৯৭ শতাংশ পাশের হার। কিন্তু বাস্তবতা হলো— এমন রেকর্ড পাশের হারের চমকপ্রদ পরিসংখ্যান দিয়ে রাজনৈতিক জনসভায় বাহবা পাওয়া গেলেও, দিনশেষে আমরা তৈরি করেছি এক বিশাল ‘ডিগ্রিধারী অদক্ষ বাহিনী’।এই প্রক্রিয়ায় আমরা শুধু শিক্ষার মানকেই বিসর্জন দেয়নি, বরং শিক্ষার্থীদের মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছি যে-পরিশ্রম না করেও ‘সিস্টেমের’ মাধ্যমে পার হওয়া সম্ভব। এটি মেধার অবমূল্যায়ন এবং প্রকৃত মেধাবীদের জন্য এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক অবিচার। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেখানে তাদের মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরো কঠোর ও গুণগত করছে, আমরা তখন হেঁটেছি উল্টো পথে। ফিনল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে পরীক্ষার গ্রেড বাড়ানোর চেয়ে শিক্ষার্থীর ‘গভীর শিখন’ বা ডিপ লার্নিং এবং ‘সমস্যা সমাধানের দক্ষতা’ যাচাই করা হয়। সেখানে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে পাশের হার বাড়ানো হয় না। ফলে তাদের একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও বৈশ্বিক মানদণ্ডে অত্যন্ত দক্ষ।

যুক্তরাজ্যে এক সময় যখন জিপিএ বা গ্রেড দেওয়ার হার অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল, তখন সে দেশের শিক্ষাবিদ ও নিয়োগকর্তারা একে ‘গ্রেড স্ফীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন, যদি সবাই ‘A’ পায়, তবে নিয়োগকর্তারা প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিকে খুঁজে পাবেন না। পরবর্তীকালে তারা মূল্যায়ন পদ্ধতি আরো কঠোর করে শিক্ষার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করে।

আন্তর্জাতিক ছাত্র মূল্যায়ন কর্মসূচি বা পিআইএসএ র‍্যাঙ্কিংয়ে যে দেশগুলো শীর্ষে থাকে তাদের মূল্যায়নের মানদণ্ড এতটাই স্বচ্ছ যে, সেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগই নেই। তাদের পাশের হার হয়তো আমাদের মতো সবসময় ৯০ বা ৯৭ শতাংশ হয় না, কিন্তু তাদের একেকজন গ্র্যাজুয়েট বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য হয়ে ওঠে।

পরিকল্পনার অভাব ও উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ 

বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো ‘ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই’ বা চাহিদার সাথে শিক্ষার সমন্বয়ের অভাব। আমাদের দেশে বছরে ঠিক কতজন ডাক্তার, কতজন আইনজীবী, কতজন শিক্ষক বা কতজন বিজ্ঞানী প্রয়োজন-তার কোনো বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা বা ডেটাবেজ মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খুঁজে দেখেছি- এমন ডাটাবেজ তাদের নেই। তাদের ভরসা পরিসংখ্যান ব্যুরো।  তবে যুগোউপযোগী শিক্ষা নিশ্চিতকরণে, যে ধরণের পরিসংখ্যান প্রয়োজন, তা পরিসংখ্যান ব্যুরো করে না।

অথচ সঠিক ডাটাবেজ না থাকার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষাকে একটি উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তরিত করেছে। যার একটি ভয়াবহ উদাহরণ হলো ‘আইন’ বিভাগ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের মুনাফার প্রয়োজনে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে আইন বিভাগে ভর্তি করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল প্রতিবছর তাদের নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থীকে তালিকাভুক্ত করে। ফলে দেখা যায়, লাখো শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিলেও দিনশেষে ৫-১০ হাজার জনই সনদ পায়। বাকি বিশাল অংশটি না পারে আইন পেশায় যোগ দিতে, না পারে অন্য কোনো চাকরিতে (যেমন: শিক্ষকতা, ব্যাংকিং, করপোরেট মার্কেটিং, এইচআর বা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বা এনজিওর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রোলগুলোতে) প্রবেশ করতে। কারণ তাদের ডিগ্রির বিশেষত্ব তাদের অন্য পেশার জন্য অযোগ্য করে রাখে। অর্থ্যাৎ, রাষ্ট্রের  সমন্বয়হীনতার বলি হচ্ছে লাখো তরুণের স্বপ্ন ও সম্পদ।

অভিন্ন চিত্র চিকিৎসা শিক্ষায় 

চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই রকম এক ভয়াবহ চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশে গত দেড় দশকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা মাশরুমের মতো বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই গেছে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও একজন জটিল রোগী যখন জীবনের শেষ ভরসা হিসেবে একজন দক্ষ চিকিৎসকের খোঁজ করেন, তখন তিনি অবলীলায় সেই ৯০ দশকে ঢাকা, রাজশাহী বা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করা অভিজ্ঞ চিকিৎসকদেরই খুঁজে বেড়ান। অবস্থা এমন এক করুণ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা অধিকাংশ চিকিৎসকই তাদের ভিজিটিং কার্ড বা নেমপ্লেটে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম লিখতে এক ধরনের হীনম্মন্যতা বা দ্বিধাবোধ করেন। যা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, পর্যাপ্ত তদারকি, মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরি এবং হাতে-কলমে শেখার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল মুনাফার লোভে ‘ডাক্তার’ তৈরি করছে। পর্যাপ্ত গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের অভাব আমাদের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল খাতটিকেও গভীর সংকটে ফেলেছে।

চীনের শিক্ষা বিপ্লব ও আমাদের করণীয় 

চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নেও চীন সম্প্রতি দারুণ উন্নতি করেছে। দেশটি কেবল ডাক্তার সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর দেয়নি, বরং তারা ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজড রেসিডেন্সি ট্রেনিং’ বাধ্যতামূলক করেছে। এর মাধ্যমে দেশটিতে চিকিৎসা শিক্ষায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। সেখানে এখন ৫ বছর পড়ার পর আরো ৩ বছর বাধ্যতামূলক ক্লিনিক্যাল ট্রেনিং নিতে হয়, যা অদক্ষ ডাক্তার তৈরির পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া তাদের ‘পল্লী-কেন্দ্রিক চিকিৎসা শিক্ষা’ মডেল আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বড় পাথেয় হতে পারে, যেখানে গ্রামের মানুষের জন্য দক্ষ চিকিৎসকের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে চীন থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে তাদের কারিগরি বা বৃত্তিমূলক পাঠ পদ্ধতি।

চীন যখন বুঝতে পেরেছিল যে কেবল তত্ত্বীয় শিক্ষা দিয়ে বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়, তখন তারা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। আশির দশকে চীন তাদের সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার একটি বড় অংশকে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার অধীনে নিয়ে আসা বাধ্যতামূলক করে- এমনকি তারা এ বিষয়ে ‘বৃত্তিমূলক শিক্ষা আইন, ১৯৯৬’ প্রণয়ন করে। তাদের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সুফল আজ সারা দুনিয়া দেখছে। চীনের একজন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীও কলম, ক্যালকুলেটর বা ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরি করতে সক্ষম।

বিপরীতে আমাদের দেশের চিত্র খুবই করুণ। মানিকগঞ্জের একজন সাধারণ মেকানিক নিজে যখন মেধা ও দক্ষতায় হেলিকপ্টার বানিয়ে বিশ্বকে অবাক করে দেয়, তখন আমাদের দেশের একজন সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী প্রকৌশলীকে দেখা যায় সাধারণ একটি অটোরিকশার ডিজাইনে সীমাবদ্ধ থাকতে। এর অর্থ হলো, আমাদের পাঠ্যক্রম এবং মেধার সঠিক ব্যবহারের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব।

দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই— এটি আজ স্বীকৃত ধ্রুব সত্য। তবে বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে রাতারাতি অসংখ্য নতুন কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে ‘শিক্ষা বিপ্লব’ আনা এক দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। তবে এই সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে আমাদের হাতের কাছে থাকা অবকাঠামোয়।

বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে জেলা-উপজেলায় অসংখ্য কলেজকে সরকারিকরণ করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় সেখানে অনার্স কোর্সও চালু করা হয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, গবেষণাগার ও পর্যাপ্ত উপকরণ ছাড়াই এসব কলেজে নামমাত্র অনার্স পড়িয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার ‘বেকার গ্র্যাজুয়েট’ তৈরি করা হচ্ছে। অথচ এসব কলেজগুলোয় অনার্স কোর্স বাদ দিয়ে, সেখানে যদি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু করা যায়-তাহলে তা হবে শিক্ষার এক বৈপ্লবিক রূপান্তর।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যদি কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক ইনস্টিটিউটে রূপান্তর করা যায়, তবে সরকারকে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণ বা দালান নির্মাণের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে না। বরং বিদ্যমান শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবরেটরিগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সজ্জিত করে অতি দ্রুত সেখানে উচ্চতর কারিগরি শিক্ষা (যেমন: তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক কৃষি প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স বা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং) শুরু করা সম্ভব।

এই কৌশলগত রূপান্তর বা ‘স্ট্রাকচারাল শিফট’ যদি আজ শুরু করা যায়, তবে চীনের সেই বিখ্যাত মডেলের মতো আগামী মাত্র ৫ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তির উত্থান দেখবে। অনার্স শিক্ষার সার্টিফিকেটের মোহ ত্যাগ করে আমরা যদি বৃত্তিমূলক শিক্ষায় মনোনিবেশ করি, তবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে এর চেয়ে বড় কোনো উল্লম্ফন আর হতে পারে না। তাই বলা যায়, দেশের শিক্ষার মূল সংকট নকলে নয়, বরং দক্ষতাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা প্রসারের অনীহা এবং শিক্ষার অতি-রাজনৈতিকীকরণ।

শিক্ষামন্ত্রীর হেলিকপ্টার সফর কেবল নকল ধরার প্রতীকী অভিযান না হয়ে যদি শিক্ষা প্রশাসনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মূলে আঘাত হানার সূচনা হয়, তবেই তা প্রকৃত সাফল্য বয়ে আনবে। আমরা চাই না আমাদের সন্তানরা কেবল জিপিএ-৫ এর সংখ্যাতাত্ত্বিক জৌলুসে নিজেদের সঁপে দিক; আমরা চাই তারা বিশ্বমানের দক্ষ জনশক্তি হয়ে উঠুক। ২০ কোটি মানুষের এই ছোট ভূখণ্ডে জনশক্তিকে যদি আমরা দ্রুত ‘সম্পদে’ রূপান্তর করতে না পারি, তবে এই শিক্ষিত বেকারত্বই একদিন জাতীয় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। শিক্ষামন্ত্রীর হেলিকপ্টার যেন কেবল নকল ধরার যন্ত্র না হয়ে, বাংলাদেশের স্থবির শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের এক শক্তিশালী বার্তাবাহক হয়-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: জুবায়ের আল মাহমুদ (শিক্ষা, সমাজ ও পরিবেশ উন্নয়ন বিশ্লেষক)

ট্যাগ :
জনপ্রিয় খবর

বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দল বরগুনা জেলা শাখার উদ্যোগে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ

শিক্ষার সংকট নকলে নয়

আপডেট এর সময় : ০১:১৮:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬
অনলাইন ডেস্ক:

আসন্ন এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নকল রুখতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ‘হেলিকপ্টার অভিযান’ ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি শিক্ষাঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মন্ত্রীর এই পুরনো স্টাইলে ফিরে যাওয়া শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মনে একটি বাড়তি সতর্কবার্তা দেবে— এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য ২০২৬ সালের বাংলাদেশে শিক্ষার সংকট কেবল ‘নকল’ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা আজ লক্ষ্যহীনতা, গবেষণার অভাব এবং লাগামহীন বাণিজ্যিকীকরণের এক চক্রে বন্দি।

প্রযুক্তির যুগে সংকটের রূপান্তর 

এক সময় পরীক্ষার হলে বই নিয়ে ঢোকা বা দেখে লেখার একটা চল ছিল এটা সত্য। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ নকলের কথা কেউ চিন্তাও করতে পারে না। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের প্রথম মেয়াদের কার্যকরী পদক্ষেপের কারণেই দেশ আজ নকলমুক্ত হয়েছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা নকল নয়। বিগত এক দশকে আমরা দেখেছি, প্রযুক্তির অপব্যবহারে ‘নকল’ শব্দটির সংজ্ঞা বদলে গেছে।

তবে এটা অবশ্যই বলতে হয়, যে, মন্ত্রীর এই ‘অ্যাকশন’ মুড শিক্ষা প্রশাসনের ঝিমিয়ে পড়া কর্মকর্তা এবং কেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের মনে একটি ভীতি ও সাবধানতা তৈরি করবে। শিক্ষার্থীরা অন্তত পড়ার টেবিলে ফেরার একটা তাগিদ অনুভব করবে— যা বর্তমানের মোবাইল আসক্তি ও মাদকের ভয়াল থাবা থেকে তাদের ফেরাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তাই এবারের আসন্ন এসএসসি পরীক্ষায় শিক্ষামন্ত্রীর ‘হেলিকপ্টার অভিযান’-এর সিদ্ধান্তকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে চাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল কেন্দ্র পাহারা দিয়ে কি একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা রক্ষা করা সম্ভব?- এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে জানতে হবে আমাদের মূল সংকট এবং বৈশ্বিক বাস্তবতা।উদার মূল্যায়নের বিষবৃক্ষে মেধার অবমূল্যায়ন 

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গভীর ক্ষতটি তৈরি হয়েছে গত দেড় দশকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশে’ পাশের হার ও জিপিএ-৫ বাড়ানোর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে।

বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, রাষ্ট্রীয় সাফল্যের কৃত্রিম পরিসংখ্যান দেখাতে অঘোষিত নির্দেশে শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো ‘উদারভাবে’ খাতা দেখার জন্য। এর ফলে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত ‘গ্রেস কালচার’। ২৩ পাওয়া শিক্ষার্থীকে ৩৩ দিয়ে পাশ করানো বা ৭২ পাওয়া শিক্ষার্থীকে গ্রেস নম্বর দিয়ে ৮০ বানিয়ে জিপিএ-৫ দেওয়ার এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু হয়েছিল; যা দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। এমনকি আমরা কোনো কোনো শিক্ষাবোর্ডে দেখেছি ৯৭ শতাংশ পাশের হার। কিন্তু বাস্তবতা হলো— এমন রেকর্ড পাশের হারের চমকপ্রদ পরিসংখ্যান দিয়ে রাজনৈতিক জনসভায় বাহবা পাওয়া গেলেও, দিনশেষে আমরা তৈরি করেছি এক বিশাল ‘ডিগ্রিধারী অদক্ষ বাহিনী’।এই প্রক্রিয়ায় আমরা শুধু শিক্ষার মানকেই বিসর্জন দেয়নি, বরং শিক্ষার্থীদের মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছি যে-পরিশ্রম না করেও ‘সিস্টেমের’ মাধ্যমে পার হওয়া সম্ভব। এটি মেধার অবমূল্যায়ন এবং প্রকৃত মেধাবীদের জন্য এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক অবিচার। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেখানে তাদের মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আরো কঠোর ও গুণগত করছে, আমরা তখন হেঁটেছি উল্টো পথে। ফিনল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে পরীক্ষার গ্রেড বাড়ানোর চেয়ে শিক্ষার্থীর ‘গভীর শিখন’ বা ডিপ লার্নিং এবং ‘সমস্যা সমাধানের দক্ষতা’ যাচাই করা হয়। সেখানে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে পাশের হার বাড়ানো হয় না। ফলে তাদের একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও বৈশ্বিক মানদণ্ডে অত্যন্ত দক্ষ।

যুক্তরাজ্যে এক সময় যখন জিপিএ বা গ্রেড দেওয়ার হার অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল, তখন সে দেশের শিক্ষাবিদ ও নিয়োগকর্তারা একে ‘গ্রেড স্ফীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন, যদি সবাই ‘A’ পায়, তবে নিয়োগকর্তারা প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিকে খুঁজে পাবেন না। পরবর্তীকালে তারা মূল্যায়ন পদ্ধতি আরো কঠোর করে শিক্ষার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করে।

আন্তর্জাতিক ছাত্র মূল্যায়ন কর্মসূচি বা পিআইএসএ র‍্যাঙ্কিংয়ে যে দেশগুলো শীর্ষে থাকে তাদের মূল্যায়নের মানদণ্ড এতটাই স্বচ্ছ যে, সেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগই নেই। তাদের পাশের হার হয়তো আমাদের মতো সবসময় ৯০ বা ৯৭ শতাংশ হয় না, কিন্তু তাদের একেকজন গ্র্যাজুয়েট বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য হয়ে ওঠে।

পরিকল্পনার অভাব ও উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ 

বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো ‘ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই’ বা চাহিদার সাথে শিক্ষার সমন্বয়ের অভাব। আমাদের দেশে বছরে ঠিক কতজন ডাক্তার, কতজন আইনজীবী, কতজন শিক্ষক বা কতজন বিজ্ঞানী প্রয়োজন-তার কোনো বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা বা ডেটাবেজ মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে খুঁজে দেখেছি- এমন ডাটাবেজ তাদের নেই। তাদের ভরসা পরিসংখ্যান ব্যুরো।  তবে যুগোউপযোগী শিক্ষা নিশ্চিতকরণে, যে ধরণের পরিসংখ্যান প্রয়োজন, তা পরিসংখ্যান ব্যুরো করে না।

অথচ সঠিক ডাটাবেজ না থাকার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষাকে একটি উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তরিত করেছে। যার একটি ভয়াবহ উদাহরণ হলো ‘আইন’ বিভাগ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের মুনাফার প্রয়োজনে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে আইন বিভাগে ভর্তি করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল প্রতিবছর তাদের নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থীকে তালিকাভুক্ত করে। ফলে দেখা যায়, লাখো শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিলেও দিনশেষে ৫-১০ হাজার জনই সনদ পায়। বাকি বিশাল অংশটি না পারে আইন পেশায় যোগ দিতে, না পারে অন্য কোনো চাকরিতে (যেমন: শিক্ষকতা, ব্যাংকিং, করপোরেট মার্কেটিং, এইচআর বা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বা এনজিওর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রোলগুলোতে) প্রবেশ করতে। কারণ তাদের ডিগ্রির বিশেষত্ব তাদের অন্য পেশার জন্য অযোগ্য করে রাখে। অর্থ্যাৎ, রাষ্ট্রের  সমন্বয়হীনতার বলি হচ্ছে লাখো তরুণের স্বপ্ন ও সম্পদ।

অভিন্ন চিত্র চিকিৎসা শিক্ষায় 

চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই রকম এক ভয়াবহ চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশে গত দেড় দশকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা মাশরুমের মতো বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই গেছে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও একজন জটিল রোগী যখন জীবনের শেষ ভরসা হিসেবে একজন দক্ষ চিকিৎসকের খোঁজ করেন, তখন তিনি অবলীলায় সেই ৯০ দশকে ঢাকা, রাজশাহী বা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করা অভিজ্ঞ চিকিৎসকদেরই খুঁজে বেড়ান। অবস্থা এমন এক করুণ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা অধিকাংশ চিকিৎসকই তাদের ভিজিটিং কার্ড বা নেমপ্লেটে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম লিখতে এক ধরনের হীনম্মন্যতা বা দ্বিধাবোধ করেন। যা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, পর্যাপ্ত তদারকি, মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরি এবং হাতে-কলমে শেখার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল মুনাফার লোভে ‘ডাক্তার’ তৈরি করছে। পর্যাপ্ত গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের অভাব আমাদের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল খাতটিকেও গভীর সংকটে ফেলেছে।

চীনের শিক্ষা বিপ্লব ও আমাদের করণীয় 

চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নেও চীন সম্প্রতি দারুণ উন্নতি করেছে। দেশটি কেবল ডাক্তার সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর দেয়নি, বরং তারা ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজড রেসিডেন্সি ট্রেনিং’ বাধ্যতামূলক করেছে। এর মাধ্যমে দেশটিতে চিকিৎসা শিক্ষায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। সেখানে এখন ৫ বছর পড়ার পর আরো ৩ বছর বাধ্যতামূলক ক্লিনিক্যাল ট্রেনিং নিতে হয়, যা অদক্ষ ডাক্তার তৈরির পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া তাদের ‘পল্লী-কেন্দ্রিক চিকিৎসা শিক্ষা’ মডেল আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বড় পাথেয় হতে পারে, যেখানে গ্রামের মানুষের জন্য দক্ষ চিকিৎসকের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে চীন থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে তাদের কারিগরি বা বৃত্তিমূলক পাঠ পদ্ধতি।

চীন যখন বুঝতে পেরেছিল যে কেবল তত্ত্বীয় শিক্ষা দিয়ে বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়, তখন তারা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। আশির দশকে চীন তাদের সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার একটি বড় অংশকে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার অধীনে নিয়ে আসা বাধ্যতামূলক করে- এমনকি তারা এ বিষয়ে ‘বৃত্তিমূলক শিক্ষা আইন, ১৯৯৬’ প্রণয়ন করে। তাদের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সুফল আজ সারা দুনিয়া দেখছে। চীনের একজন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীও কলম, ক্যালকুলেটর বা ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরি করতে সক্ষম।

বিপরীতে আমাদের দেশের চিত্র খুবই করুণ। মানিকগঞ্জের একজন সাধারণ মেকানিক নিজে যখন মেধা ও দক্ষতায় হেলিকপ্টার বানিয়ে বিশ্বকে অবাক করে দেয়, তখন আমাদের দেশের একজন সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী প্রকৌশলীকে দেখা যায় সাধারণ একটি অটোরিকশার ডিজাইনে সীমাবদ্ধ থাকতে। এর অর্থ হলো, আমাদের পাঠ্যক্রম এবং মেধার সঠিক ব্যবহারের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব।

দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই— এটি আজ স্বীকৃত ধ্রুব সত্য। তবে বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে রাতারাতি অসংখ্য নতুন কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে ‘শিক্ষা বিপ্লব’ আনা এক দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। তবে এই সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে আমাদের হাতের কাছে থাকা অবকাঠামোয়।

বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে জেলা-উপজেলায় অসংখ্য কলেজকে সরকারিকরণ করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় সেখানে অনার্স কোর্সও চালু করা হয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, গবেষণাগার ও পর্যাপ্ত উপকরণ ছাড়াই এসব কলেজে নামমাত্র অনার্স পড়িয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার ‘বেকার গ্র্যাজুয়েট’ তৈরি করা হচ্ছে। অথচ এসব কলেজগুলোয় অনার্স কোর্স বাদ দিয়ে, সেখানে যদি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু করা যায়-তাহলে তা হবে শিক্ষার এক বৈপ্লবিক রূপান্তর।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যদি কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক ইনস্টিটিউটে রূপান্তর করা যায়, তবে সরকারকে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণ বা দালান নির্মাণের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে না। বরং বিদ্যমান শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবরেটরিগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সজ্জিত করে অতি দ্রুত সেখানে উচ্চতর কারিগরি শিক্ষা (যেমন: তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক কৃষি প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স বা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং) শুরু করা সম্ভব।

এই কৌশলগত রূপান্তর বা ‘স্ট্রাকচারাল শিফট’ যদি আজ শুরু করা যায়, তবে চীনের সেই বিখ্যাত মডেলের মতো আগামী মাত্র ৫ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তির উত্থান দেখবে। অনার্স শিক্ষার সার্টিফিকেটের মোহ ত্যাগ করে আমরা যদি বৃত্তিমূলক শিক্ষায় মনোনিবেশ করি, তবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে এর চেয়ে বড় কোনো উল্লম্ফন আর হতে পারে না। তাই বলা যায়, দেশের শিক্ষার মূল সংকট নকলে নয়, বরং দক্ষতাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা প্রসারের অনীহা এবং শিক্ষার অতি-রাজনৈতিকীকরণ।

শিক্ষামন্ত্রীর হেলিকপ্টার সফর কেবল নকল ধরার প্রতীকী অভিযান না হয়ে যদি শিক্ষা প্রশাসনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মূলে আঘাত হানার সূচনা হয়, তবেই তা প্রকৃত সাফল্য বয়ে আনবে। আমরা চাই না আমাদের সন্তানরা কেবল জিপিএ-৫ এর সংখ্যাতাত্ত্বিক জৌলুসে নিজেদের সঁপে দিক; আমরা চাই তারা বিশ্বমানের দক্ষ জনশক্তি হয়ে উঠুক। ২০ কোটি মানুষের এই ছোট ভূখণ্ডে জনশক্তিকে যদি আমরা দ্রুত ‘সম্পদে’ রূপান্তর করতে না পারি, তবে এই শিক্ষিত বেকারত্বই একদিন জাতীয় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। শিক্ষামন্ত্রীর হেলিকপ্টার যেন কেবল নকল ধরার যন্ত্র না হয়ে, বাংলাদেশের স্থবির শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের এক শক্তিশালী বার্তাবাহক হয়-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: জুবায়ের আল মাহমুদ (শিক্ষা, সমাজ ও পরিবেশ উন্নয়ন বিশ্লেষক)