খুলনাঞ্চলে চুইঝালে সম্ভাবনার হাতছানি

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, খুলনা
চুইঝাল—একটি ঔষধিগুণসম্পন্ন মসলা জাতীয় ফসল। রান্নার স্বাদ বৃদ্ধির পাশাপাশি ভেষজ গুণেও সমৃদ্ধ এই উপাদান বর্তমানে দক্ষিণ—পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে দিচ্ছে। বিশেষত খুলনা অঞ্চলজুড়ে এর বাণিজ্যিক চাষাবাদ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এরই ধারাবাহিকতায় চুইঝাল এখন শুধু গৃহস্থালি রান্নার অংশ নয়, বরং হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম। বর্তমানে খুলনা জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ডুমুরিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি চুইঝাল উৎপাদন হচ্ছে। সেখানে প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে এই লাভজনক ফসলটি। এছাড়া পাইকগাছায় ৯ হেক্টর, বটিয়াঘাটায় ৮ হেক্টর, রূপসায় ৫ হেক্টর ও ফুলতলায় ৫ হেক্টর জমিতে এর চাষাবাদ হচ্ছে। এদিকে, কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার তথ্য মতে, বর্তমানে জেলায় বছরে প্রায় ২৫০ মেট্রিক টন চুইঝাল উৎপন্ন হচ্ছে। গড় উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ৪.১৭ মেট্রিক টন। এর বাজার মূল্যও আশাজাগানিয়া।

ভালো মানের চুইঝাল পাইকারি বাজারে প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকায়। অপেক্ষাকৃত কম মানের চুই পাওয়া যাচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। খুচরা বিক্রেতারা ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেন। গড় দামে হিসাব করলে, দেশে চুইঝালের বর্তমান বাজারের পরিমাণ প্রায় একশ কোটি টাকা। একই সঙ্গে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইলে মিলিয়ে মোট উৎপাদন ছিল প্রায় ৬০০ টন, যা আগের বছর ছিল ৫৫০ টন। অর্থাৎ, প্রতিবছরই বাড়ছে উৎপাদন। চুইঝালের অনলাইন বাজারও স¤প্রসারিত হচ্ছে দ্রুত। খুলনার চুইঝাল অনলাইনে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘উড়া’র স্বত্বাধিকারী শরিফুল ইসলাম হিরণ বলেন, “সারা দেশের ভোজনরসিকদের পছন্দের তালিকায় এখন শীর্ষে রয়েছে খুলনার চুইঝাল। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে ঘিরে এর চাহিদা বহুগুণে বেড়ে যায়। অন্য সময়েও এর বিক্রি থাকে নিয়মিত।”

এ বিষয়ে আরও জানান, “আগে মানুষ শখের বসে বাড়ির আঙিনায় চুইঝালের গাছ লাগাতো। কিন্তু এখন কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ করছেন। ডুমুরিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি চুইঝাল উৎপাদন হয়। নার্সারিগুলো এখন বছরে হাজার হাজার চারা সরবরাহ করছে।” ডুমুরিয়ার কৃষক নবদ্বীপ মল্লিক বলেন, “কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চুইঝাল পাঠানো হচ্ছে। চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিক্রিও। তিন—চার বছর আগেও যেখানে ২—৩ হাজার চারা বিক্রি হতো, এখন তা বেড়ে ৫০—৬০ হাজারে দাঁড়িয়েছে।” অপর কৃষক নিউটন মণ্ডল বলেন, “আমার তিন বিঘা জমিতে চুইঝাল আছে।

এখান থেকে বছরে ২—৩ লাখ টাকার চুই, চারা এবং পাউডার বিক্রি করি। নষ্ট রোধে আমরা এখন চুইঝাল শুকিয়ে পাউডার করে বিক্রি করছি, যেটি থাইল্যান্ডেও রপ্তানি করেছি।” চুইঝালের গুণাগুণ নিয়েও আশাবাদী কৃষক ও গবেষকরা। কৃষি বিভাগ জানায়, চুইঝাল শুধুমাত্র স্বাদ বৃদ্ধিকারী নয়, এটি ক্যানসার, হৃদরোগ, গ্যাস্ট্রিক, অনিদ্রা, কাশি, অ্যাজমা ও লিভারের সমস্যায় কার্যকর প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবেও কাজ করে। চুইঝালে থাকা আইসোফ্লাভোন, অ্যালকালয়েড, গ্লাইকোসাইডস, সিজামিনসহ নানা উপাদান শরীরকে রাখে সতেজ ও রোগমুক্ত।

খুলনা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “চুইঝালের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির প্রবণতা খুলনার কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। ফলে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে এবং তারা বাণিজ্যিকভাবে এ ফসলে ঝুঁকছেন।” সব মিলিয়ে বলা যায়, খুলনার ঐতিহ্যবাহী চুইঝাল এখন শুধুই খাদ্যরসিকদের আকর্ষণ নয়, বরং হয়ে উঠেছে কৃষকদের ভাগ্য বদলের হাতিয়ার। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রবেশ ঘটলে খুলনার অর্থনীতিতে চুইঝাল হয়ে উঠবে এক নবতর সম্ভাবনার নাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *