৩৭ বছরের ভাঙা-গড়ার গল্পে কোটি কোটি টাকার হেলায়, চাই স্থায়ী সমাধান

মো. আব্দুল কুদ্দুস
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ

কৃষকদের ধান রক্ষার জন্য প্রায় ৩৭ বছর ধরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ব্রিজের মাধ্যমে নদী থেকে তোলা বালু দিয়ে তৈরি করা হয় অস্থায়ী রাউতারা রিং বাঁধ। তিনটি জেলার হাজার হাজার হেক্টর ধান রক্ষায় প্রতি বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড এই বাঁধে ব্যয় করে কোটি কোটি টাকা। একইসঙ্গে চলে পুকুরচুরি। অথচ একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করলে প্রতিবছর সরকারের এই বিপুল পরিমাণ টাকা জলে ভেসে যেত না।

নির্মিত এই রিং বাঁধ বরাবরই রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। বাঁধে যে পরিমাণ মাটি ও বালি ফেলার কথা, তা কোনো বছরই ঠিকভাবে ফেলা হয় না। তাছাড়াও প্রতি বছর বাঁধটির কিছু অংশ ভেঙে দেওয়ার পর বাদবাকি অংশে আবারও শুরু হয় নির্মাণ কাজ। এতে প্রভাবশালী মহল জড়িত থাকায় বাঁধ নির্মাণে চলে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। বছরের পর বছর ধরে এই বাঁধকে কেন্দ্র করে চলছে সরকারি অর্থের হরিলুট। এটি যেন অনেকের বার্ষিক আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে—যার দেখভালের কেউ নেই।

জানা যায়, হাটপাকিয়া ইউনিয়নের রাউতারা স্লুইস গেটের পশ্চিম পাশে ১,২৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এ বাঁধ নির্মাণে এ বছর ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। স্থানীয় কৃষকদের ধান রক্ষার নামে বালু দিয়ে অস্থায়ী এ বাঁধ নির্মাণ ও ভাঙার কাজ চলছে বছরের পর বছর। যদিও প্রতি বছরই বাঁধটি নির্মাণের এক থেকে দেড় মাসের মাথায় মাছ আহরণ ও নৌকা চলাচলের সুবিধার্থে অদৃশ্য শক্তির ইশারায় কেটে দেয় স্থানীয় মৎস্য শিকারি ও নৌযান শ্রমিকরা। এভাবে বছরের পর বছর চলছে বাঁধটি ভাঙা ও গড়ার কাজ।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর তথা চলনবিলের হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমির ধান রক্ষায় একটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। যা ১৯৮০ সালে শেষ হয়। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধটি ১৯৮৮ সালের দশকব্যাপী ইতিহাসের ভয়াবহতম বন্যায় বাঘাবাড়ি-নিমাইচড়া অংশের রাউতারা স্লুইস গেটের পশ্চিম পাশে ভেঙে যায়। সেই থেকে প্রতি বছর ঐ অঞ্চলের কৃষিজমির ধান রক্ষায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে এই স্থানটিতে বালি দিয়ে রিং বাঁধ তৈরি করে। বাঁধটির নির্মাণ কাজ মার্চ মাসে শুরু হয় এবং বাঁধের স্থায়িত্ব ২৮ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধ না ভাঙলেও প্রতি বছর জুন মাসের শেষ দিকে মাছ আহরণ ও নৌকা চলাচলের সুবিধার্থে কেটে দেন মৎস্য শিকারি ও নৌযান শ্রমিকরা। এতে চোখের সামনে সরকারের কোটি কোটি টাকা জলে ভেসে যায়। আর স্থানীয়রা বাঁধের পাইলিংয়ের বাঁশ, খুঁটি ও বালুর বস্তা লুট করে বিক্রি করেন। অথচ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন কঠোর নজরদারি করলে বাঁধটি সহজেই রক্ষা করা যেত।

এলাকাবাসী ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও পাবনাসহ চলনবিল এলাকার প্রায় ৬২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়। অনেক সময় নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধের কিছু অংশ ভাঙনের সৃষ্টি হয়। এতে আমাদের উৎপাদিত ধান অনেক সময় পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে ধান কেটে ঘরে তোলা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। অনেক সময় ধান কাটা সম্ভব হয় না। প্রতি বছরই আমরা এই বাঁধ নিয়ে শঙ্কিত থাকি। এবার পানি কম থাকায় ধান কাটা প্রায় শেষের দিকে।

তারা আরও জানান, নিমাইচরা বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছিল উত্তর পাশের সব জমিগুলোকে ত্রি-ফসলী জমির আওতায় আনার জন্য। কিন্তু লুটপাটের কৌশল অবলম্বনের জন্য ১৯৮৮ সালের পর থেকে প্রতি বছরই বালু দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এছাড়াও রাউতারা স্লুইস গেটটিও প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। স্লুইস গেটটি সংরক্ষণসহ একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও দুর্নীতি বন্ধের দাবি জানান তারা।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নজরিন আহমেদ জানান, এখানে একটি স্থায়ী বাঁধসহ একটি পাম্প হাউজ নির্মাণ হলে দুই ফসলী জমিতে বহুমাত্রিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। এছাড়াও এ অঞ্চলের ৩ হাজার হেক্টর গরু-চারণ ভূমি বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় কৃষকরা তাদের গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েন। পাশাপাশি ঘাসের জমি ডুবে যাওয়ায় গো-খাদ্যের চরম সংকট সৃষ্টি হয়। তাই এখানে একটি স্থায়ী বাঁধসহ একটি পাম্প হাউজ নির্মাণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী ইমতিয়াজ আহম্মদের কাছে বালু দিয়ে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার প্রাক্কলনে বালু দিয়েই বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী টপ ৪ মিটার রেখা কাজ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য বৃহত্তর পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং এটি বাস্তবায়ন হলে এই সমস্যা আর থাকবে না।

এদিকে, একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হলে শাহজাদপুরসহ চলনবিলের এক ফসলি জমিতে ১২ মাসই বহুমাত্রিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে। যা জাতীয় অর্থনীতিকেও আরও শক্তিশালী ও মজবুত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে জানিয়েছেন সচেতন মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *