মাটিচাপা নবজাতক উদ্ধার/ অভাব-অনটনের নির্মম সিদ্ধান্ত: বলেন নবজাতকের মা-বাবা

গাজীপুর প্রতিনিধি:
‎গাজীপুরের টঙ্গীর মরকুন মধ্যপাড়ায় ঠিক সকাল সাতটা বাজতেই শুরু হয় এক হৃদয়বিদারক সকাল। এলাকার মানুষ যেমন প্রতিদিনের মতো রাস্তায় বের হয়েছে— কেউ কাজের উদ্দেশ্যে, কেউ হাঁটতে- তখনই হঠাৎ ভেসে আসে ক্ষীণ, কাঁপা কাঁপা এক কান্না। প্রথমে সবাই ভেবেছিল হয়তো কোনো শিশুর কান্না। কিন্তু আশপাশে কোনো শিশু নেই। কান্নার শব্দ ক্রমাগত স্পষ্ট হচ্ছে, কিন্তু উৎস অদৃশ্য। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে মানুষ টের পায়— শব্দটি আসছে ঠিক রাস্তার পাশের নরম মাটির নিচ থেকে। চোখ কপালে ওঠার মতো পরিস্থিতি। মাটির নিচ থেকে কি বাচ্চা কেঁদে উঠছে? বিশ্বাস করতে না পারলেও কান্না থামছে না। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন মাটির স্তর সরাতে শুরু করেন। প্রথমেই দেখা যায় কাপড়ের কোনা। তারপর পুরো কাপড়। আর কাপড়ের নিচে— এক নবজাতক। আরও ভয়াবহ দৃশ্য— শিশুটির বুকের ওপর চাপা দেওয়া ছিল একটি ইট। জন্মের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় নিষ্ঠুরভাবে মাটিচাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা— এমন দৃশ্য দেখে পথচারীদের বুক কেঁপে ওঠে। আতঙ্কে কেউ চিৎকার করে ওঠে, আবার কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না। মানুষ দ্রুত শিশুটিকে কোলে তুলে ধুয়ে-মুছে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয় এক নিঃসন্তান নারী শিশুটিকে দত্তক হিসেবে আশ্রয়ে নেন। ঘটনার পরপরই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে হৈচৈ। কে এমন অমানবিক কাজ করতে পারে? পথচারীরা, প্রতিবেশীরা, দোকানিরা— সবার মুখে একই প্রশ্ন। সন্দেহের তীর গিয়ে লাগে মহিউদ্দিনের বাড়ির ভাড়াটিয়া দম্পতি— খালেদা ও স্বপনের দিকে। পাঁচ বছর ধরে তারা ওই বাড়িতে থাকেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে ভয়াবহ সত্য প্রকাশ পায়। খালেদা (৩০), পিতা হাফিজ উদ্দিন, মাতা ফাতেমা, ঠিকানা— নান্দাইল, ময়মনসিংহ। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে খালেদা (৩০) নামের এক নারী স্বীকার করেন, ১৩ নভেম্বর সকাল সাতটায় নিজের ঘরেই জন্ম দেন শিশুটিকে। এরপর স্বামী স্বপনের সাহায্যে বাড়ির পাশের একটি ছোট গর্ত খুঁড়ে শিশুটিকে কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে সেখানে রেখে তার বুকের ওপর একটি ইট চাপা দেন। তারপর দুজনেই ঘরে ফিরে বসে থাকেন। যেন কিছুই ঘটেনি। কেন এমন ভয়ংকর সিদ্ধান্ত? কেনই বা জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মাটিচাপা? পুলিশের এমন প্রশ্নে খালেদা ও স্বপন দুজনেই জানান, অভাব-অনটনের চাপে তারা এমন পথ বেছে নিয়েছেন। দায়িত্ব নিতে পারবেন না, শিশুটিকে মানুষ করতে পারবেন না— এই ভয় তাদের অমানবিকতার দিকে ঠেলে দেয়। এই স্বীকারোক্তি শুনে আশপাশের মানুষ বিস্মিত, ক্ষুব্ধ এবং শোকাহত। একজন মা কীভাবে নিজের সন্তানকে মাটিচাপা দিয়ে মৃত্যু উপহার দিতে পারে? জন্মের কয়েক মিনিটের মধ্যেই সন্তানকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার চিন্তা— এ যেন সভ্যতার মুখে চরম চপেটাঘাত। টঙ্গী পূর্ব থানার এসআই বায়েজিদ ঘটনাস্থলে গিয়ে পুরো বিষয়টি তদন্ত করেন। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের পর খালেদা স্বীকার করে শিশুটি তারই। দুজনই অসুস্থ থাকায় মানবিক কারণে বাড়িওয়ালার জিম্মায় রাখা হয়েছে। কেউ মামলা দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিশুটিকে নিরাপদে হস্তান্তর করা হয়েছে দত্তক পরিবারে। শিশুটির কান্না যদি পথে হাঁটতে থাকা মানুষের কানে না পৌঁছাত, তবে হয়তো অন্ধকারে হারিয়ে যেত এই নিষ্পাপ প্রাণ। মরকুনের সেই সকালে একটিমাত্র কান্না পুরো এলাকা, সমাজ ও মানবিকতাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আর প্রশ্ন তুলেছে— দারিদ্র্য কি মানুষকে এতটাই নিষ্ঠুর করে দেয়, যেখানে মায়ের ভালোবাসাও নিভে যায়?
‎তবুও জীবন জিতে গেছে। মাটির নিচ থেকে উঠে আসা কান্না— মানুষের করুণার হাত ধরে আবার ফিরে এসেছে আলোয়। সেই কান্না আজও এলাকার মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে— যেন মানবতার বেঁচে থাকার চিহ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *