ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি: ভারত হয়ে ভুটান সীমান্তে যাবে বাংলাদেশের ট্রেন

অনলাইন ডেস্কঃ

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে রেলপথ যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। এবার ভারতের ভূমি ব্যবহার করে ভুটান সীমান্তের কাছাকাছি পর্যন্ত চলাচল করবে বাংলাদেশের ট্রেন। ভুটানে রেলপথ না থাকায় বাংলাদেশের ট্রেন ভুটান পর্যন্ত চলাচলের সুযোগ নেই। তবে ভারত-ভুটান সীমান্তে ভারতের শেষ রেলস্টেশন হাসিমারা পর্যন্ত বাংলাদেশের ট্রেন চলাচল করতে পারবে।

সম্প্রতি ভারত সফরের সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে, তাতে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। দুই দেশের সমঝোতা চুক্তিতে ট্রেন চলাচলের বিষয়টিকে ট্রানজিট/ট্রান্সশিপমেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের রেলপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশ-ভুটানের বাণিজ্য ট্রান্সশিপমেন্টের অন্তর্ভুক্ত হবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের নথির তথ্য মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আটটি ইন্টারচেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ইন্টারচেঞ্জ কার্যকর। এগুলো হলো বেনাপোল-পেট্রাপোল, দর্শনা-গেদে, রোহনপুর-সিংবাধ, বিরাল-রাধিকারপুর ও চিলাহাটি-হলদিবাড়ি।

নতুন চুক্তির আওতায় চিলাহাটি দিয়ে হলদিবাড়ি স্টেশন হয়ে ভারতে প্রবেশ করবে বাংলাদেশের ট্রেন। চুক্তিতে বিকল্প রেলপথ হিসেবে বাংলাদেশের বুড়িমারী ও ভারতের চেংরাবান্ধা ইন্টারচেঞ্জের রুট চূড়ান্ত হয়েছে। তবে ভারতের ভেতর কোন রেলপথ ব্যবহার করা হবে, সেটি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ভারতের রেলপথ খুবই বিস্তৃত। ফলে বাংলাদেশ উন্মুক্ত রেলপথ সুবিধা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আপাতত শুধু ভারতে প্রবেশ এবং ভুটান সীমান্তে শেষ গন্তব্য চূড়ান্ত হয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরুর আগে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস (এসওপি) তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া করতে হবে ট্যারিফ নির্ধারণ। এসব বিষয় নির্ধারণ করতে আন্ত মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কমিটির নেতৃত্ব দেবে রেলপথ মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো থেকে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচনে রেলপথ মন্ত্রণালয় চিঠি পাঠাবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, সমঝোতা অনুযায়ী দুই দেশেই একটি করে স্ট্যান্ডিং কমিটি থাকবে। এই কমিটিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় ছাড়াও কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের প্রতিনিধি থাকবে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে কমিটি গঠন করা হবে।

কমিটি প্রতি ছয় মাস পর পুরো বিষয় পর্যালোচনা করে পরামর্শ দেবে। কমিটি চাইলে ছয় মাসের নোটিশ দিয়ে চুক্তি স্থগিত করতে পারবে। অতিরিক্ত সচিব, নাকি যুগ্ম সচিব, কোন পর্যায়ে এই কমিটি করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত করেনি রেলপথ মন্ত্রণালয়। এটি চূড়ান্ত করার পর প্রতিনিধি চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে চিঠি দেওয়া হবে।

কমিটি গঠনের পর ওই কমিটি এসওপি তৈরি করবে। এসওপিতে উল্লেখ থাকবে কোন পথে ট্রেন চলবে, ট্রেনের ধারণক্ষমতা কত হবে, ট্রেনের ইঞ্জিন-বগির জোগান কিভাবে দেওয়া হবে, জনবল ও ভাড়া কত হবে। রেলওয়ের বিদ্যমান ভাড়ার সঙ্গে ট্রানজিট/ট্রান্সশিপমেন্টের ভাড়া এক হবে না। এটি বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন নির্ধারণ করবে।

আবার বাংলাদেশের ভেতর ভারতের ট্রেন বা ভারতের ভেতর বাংলাদেশের ট্রেনের দুর্ঘটনা ঘটলে আইনি ব্যবস্থা কী হবে, সেটিও ঠিক করা হবে। নিরাপত্তার বিষয়টি দেখার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এসওপি তৈরি করে ভারতের রেলওয়ে বোর্ডকে পাঠাবে। এসওপি চূড়ান্ত হওয়ার পর ট্রেন চলাচল শুরু হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারতের পরীক্ষামূলক ট্রেন চালানোর প্রস্তাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা আগেই বৈঠক করেছি। তখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ছাড়া বাকিরা মতামত দিয়েছে। এখন যেহেতু সমঝোতা চুক্তি হয়ে গেছে, তাই দ্রুত কাজ এগোবে। ট্রেন চালানো নিয়ে কোনো তাড়াহুড়া নেই। ট্রেন চালানোর আগে কাজগুলো শেষ করা এখন গুরুত্বপূর্ণ।’

এদিকে বাংলাদেশে রেলের ট্রানজিট সুবিধা পাওয়ার বিপরীতে ভারতের ডালগাঁও পর্যন্ত রেললাইন ব্যবহারের সুযোগ দিতে চেয়েছিল ভারত সরকার। কিন্তু বাংলাদেশ হাসিমারা পর্যন্ত ট্রান্সশিপমেন্ট চেয়েছে। সেটি পাওয়াও গেছে। হাসিমারা স্টেশনের কাছে ভুটানের স্থলবন্দর আছে। নাম ফুন্টশিলিং। যদি ওই স্থলবন্দর পর্যন্ত যাওয়া যায় তাহলে ট্রান্সশিপমেন্টে ট্রেন থেকে পণ্য খালাস করে ট্রাকে ভুটানে নেওয়া যাবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. হুমায়ুন কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারতকে আমরা ট্রানজিট সুবিধা দিয়ে বিনিময়ে ভুটানের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পেয়েছি। এখন বাংলাদেশের ট্রেন ভারতে ভুটান সীমান্ত পর্যন্ত যেতে পারবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *