টাইমের বিশেষ প্রতিবেদন// তারেক রহমান দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের জন্য কী অর্থ বহন করেন

অনলাইন ডেস্ক:

দীর্ঘ ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরে আসেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার মাত্র সাত সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এখন পর্যন্ত ২১২টি আসনে জয়লাভ করে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে।

ওই সাক্ষাৎকারে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং সমাজের বিদ্যমান বিভাজন কমিয়ে আনার রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি।পরিকল্পনার অগ্রাধিকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান স্পষ্ট করে জানান, সর্বাগ্রে নিশ্চিত করতে হবে ‘আইনের শাসন’। তার ভাষায়, রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।

তিনি আরো বলেন, দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হবে আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তৃতীয় লক্ষ্য দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী টাইমে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারের আলোকে প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে।

জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পাশাপাশি শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষকে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক ক্ষত নিরাময় এবং পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন হয়ে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে।

স্বদেশে ফেরার পর থেকেই তারেক রহমান ঐক্যের বার্তা দিচ্ছেন এবং প্রতিশোধ পরিহারের অঙ্গীকার করছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিশোধ কিছুই ফিরিয়ে আনতে পারবে না। বরং আমরা যদি এটিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি, দেশকে একসঙ্গে রাখতে পারি, তাহলে সেখান থেকে ভালো কিছু অর্জন সম্ভব।’

অর্থনৈতিক রূপরেখা ও সংস্কার

শেখ হাসিনার শাসনের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশগুলোর একটি ছিল।

২০০৬ সালে দেশের জিডিপি ছিল সাত হাজার ১০০ কোটি ডলার, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৪৬ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছায়। তবে মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য ও বেকারত্বের চাপ জনঅসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও অর্থনৈতিক সংকট পুরোপুরি কাটেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও যুব বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পাওয়ায় আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা জ্বালানি ও উৎপাদন খাতে প্রভাব ফেলছে।

দেশে ৪ কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। বিএনপি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে নারী ও বেকারদের মাসিক নগদ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যদিও এর অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাত উদারীকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তারেক রহমান। পাশাপাশি প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারি।’

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক

রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতি ভারত এবং বাংলাদেশের পণ্যের শীর্ষ ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দেয়।

বিএনপির নির্বাচনী সাফল্যের পর ভারত সরকার দলটির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান মন্তব্য করেন, পূর্ববর্তী সময়ে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত কিছু চুক্তিতে ‘অসামঞ্জস্য’ রয়েছে, যা ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনে সংশোধন প্রয়োজন। তার বক্তব্য, ‘অবশ্যই আমরা প্রতিবেশী। তবে সবার আগে থাকবে বাংলাদেশের স্বার্থ ও জনগণের স্বার্থ। এরপর আমরা সম্পর্ক আরো উন্নত করার চেষ্টা করব।’

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ ‘পাল্টা শুল্ক’ আরোপ করেছিলেন। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে ২০ শতাংশ এবং পরে ১৯ শতাংশে নামানো হয়। এর বিনিময়ে বাংলাদেশ মার্কিন পণ্যের জন্য বাজার সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।

‘ইসলামপন্থী’ শক্তির উত্থান

ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপির পর দ্বিতীয় সর্বাধিক আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যদিও পূর্ববর্তী সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। অতীতে বিএনপি ও জামায়াত জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করলেও এবারের নির্বাচনে জামায়াত প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

তারেক রহমানের বক্তব্য, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারে বিশ্বাসী সব রাজনৈতিক দলের যৌথভাবে কাজ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এটি শুধু বিএনপির দায়িত্ব নয়; দেশের সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব।’ তার মতে, ৫ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে না যেতে ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি।

শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

২০২৪ সালের গণ–আন্দোলন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারে ভূমিকা পালন করেন। তাদের উদ্যোগে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হয়ে জামায়াত জোটের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেয়, যদিও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

ছাত্র–জনতার আন্দোলনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের স্মরণ করে তারেক রহমান বলেছেন, ‘যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের অনেক বড় দায়িত্ব রয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *