বাংলাদেশে অপঘাতে মৃত্যুও এক নাছোড় দানব,

আজকে সকালে পত্রিকা পড়ার পর থেকে নিজের ভেতরে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করছে। অপরাধবোধ এজন্য বলছি যে, প্রতিনিয়ত এধরনের খবর দেখে যাওয়া ছাড়া সত্যিকার অর্থে আমরা আর কিছুই করতে পারছি না বা করার চেষ্টাও করছি না!

কোথাও যুদ্ধ হয়, বেশুমার মানুষ মরে। আমরা তার খবর পড়ি আর ভুলে যাই। বাড়ির পাশে ‘বন্দুকযুদ্ধ হয়, পরদিন খবরের কাগজ থেকে জানা যায়, আরও একটি লাশ পড়েছে। যুদ্ধে যে মারে তার জবাবদিহি হয় না। যাদের মারা যায়, তারাও জানে এসব হত্যার বিচার হবে না; হয় না কদাচিৎ।

বাংলাদেশে অপঘাতে মৃত্যুও এক নাছোড় দানব,


যার লাশের ক্ষুধা মেটাতে হয় প্রতিদিন। এখানে এখন গড়ে প্রতিদিন একজন মানুষ মারা যাচ্ছে ‘যুদ্ধে’। যুদ্ধই বলছি, কারণ সরকারি বাহিনীগুলো এসব হত্যাকাণ্ডকে যুদ্ধের পরিভাষা দিয়েই চিনিয়েছে: ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি।

পত্রিকায় প্রায় দেখি প্রতিনিয়তই নিখোঁজ, গুম ও ক্রসফায়ারে লাশ পড়ছে। জানার উপায় নেই, তাদের কতজন অভিযুক্ত আর কতজন পরিস্থিতির শিকার। কিছু মানুষ আবার এগুলো সমর্থনও করেন।

কিন্তু আইনের হাতে যে রক্ত লেগে আছে, সেই রক্তাক্ত হাত যে ক্রমেই নিরীহ ব্যক্তিদেরও রক্তাক্ত করছে, এভাবে চললে যে আইনের শাসন বলে কিছু থাকবে না, তা অনেকেই বুঝতে রাজি নন। ‘অপরাধী’ বা জঙ্গি হলেও আইনের বাইরে কাউকে হত্যা করা যায় না।

এসব ঘটনা একটা জিনিসই প্রমাণ করে: কিছু জীবন খরচযোগ্য। হতে পারে তারা নারী বা শিশু, হতে পারে সাধারণ নিরীহ পুরুষ। যখন অনেক হত্যার বিচার হয় না, তখন এই ‘অনেকে’ পড়ে যান খরচযোগ্যের তালিকায়। এ ধরনের জীবনকে বলা যায় উদোম জীবন।

ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক গিওর্গিও আগামবেন বলছেন, ‘উদোম জীবন হলো তছনছ করা জীবন, রাজনৈতিক গুরুত্বহীন জীবন। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের আইনে এদের বলা হতো হোমো সাসের, যাদের হত্যা করলে শাস্তি হবে না। সহিংসতার সামনে তাদের কোনো রক্ষাকবচ নেই, হত্যার সামনে সম্পূর্ণ উদোম এ মানুষেরা। অপরাধী বা শত্রুশ্রেণির না হলেও তারা একধরনের নিষিদ্ধ মানুষ। প্রায়ই তাদের অবস্থা হয় বধযোগ্য প্রাণীর মতো।

আগামবেন বলছেন, আজকে আধুনিক রাষ্ট্রে মানুষ দুভাবে বিভক্ত। একদলের জীবন উদোম (bare life), আরেক দল সার্বভৌম ক্ষমতার (sovereign power) অধিকারী। সার্বভৌম যারা, তাদের জবাবদিহি করতে হয় না। তারা দায়মুক্ত, বিচারের ঊর্ধ্বে তাদের অবস্থান।

যেমন দায়মুক্তি ভোগ করতেন আগেকার যুগের রাজা-বাদশাহরা। আগামবেনের সিদ্ধান্ত, সার্বভৌম ক্ষমতা আইনের সীমা পেরিয়ে গেলে নাগরিকদের অনেকেই সহিংসতার সামনে উদোম হয়ে পড়ে।

অনেক সময় কর্তৃত্ববাদী সরকার সমগ্র জনগণকেই হোমো সাসের বানিয়ে ফেলতে পারে। সাধারণত গণহত্যার মধ্যে এই সর্বময় সহিংসতার দায়মুক্তি দেখা যায়। তবে যুদ্ধ ও গণহত্যা ছাড়াও সাধারণ পরিস্থিতিতেও এ ধরনের দায়মুক্ত হত্যালীলা চলতে পারে।

যে ভয়ের রাজত্ব দেশে কায়েম হয়েছে, সেখানে কিছু মানুষকে পিঁপড়ার মতো পিষে ফেলা যায়। পিঁপড়াদের সারিতে কয়েকটা পিঁপড়াকে মারলে অন্য পিঁপড়ারা লাইন বদলিয়ে আবার হাঁটা দেয়; থামে না। বাংলাদেশে জনগণের আচরণ পিঁপড়াদের মতো হয়ে গেছে!

কোনো হত্যা-অপরাধের সামনে পড়লে পিঁপড়ার মতো রাস্তা বদলে নিজের পথে হাঁটা দিই। আমরাই আবার গোল হয়ে গণপিটুনিতে মাতি, নারী নির্যাতন দেখি; কোথাও লাশ পড়লে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসি দেখতে।

বন্ধুগণ, চুপ করে বসে থাকবেন না। বুকের বন্ধ খাঁচার ভেতরে গভীর শ্বাস টানুন , চোখের কালো নেকাব খুলুন, নদী-পাহাড়-জঙ্গলে যান, কিংবা তাকান গুম-খুন হওয়া মানুষটার স্বজনের মুখের দিকে….

দেখবেন, সেই মুখ কতটা অসহায়, কান পেতে শুনুন, তাদেরও অন্তরের গভীরে নীরব কান্না চলে নিরুচ্চার, ‘যেন সে নয়, তার ভেতরে গুনগুন করে কাঁদছে কেউ।’ দেখুন, কত বিশাল পাথরচাপা মন নিয়ে কতটা পথ তারা পাড়ি দিচ্ছে। সে পথের ধুলায় কতটা অশ্রু গড়েগড়ে পড়ে। সেই দাগ শুধু স্রষ্টাই দেখে।

কেননা, প্রাণ ফিরে আসে না। যে যায় সে একা যায় না। সে নিয়ে যায় স্বজনদের প্রাণের একেকটি অংশ। প্রতিটি মৃত্যুতে তাই মৃতের স্বজনের জীবনের অনেকটা ভাগ ফাঁকা হয়ে যায়। তাদের জীবন আর কখনোই স্বাভাবিক হওয়ার নয়। আমার,আপনার স্বজনের মুখটাও কল্পনায় আনুন, তাদেরও জীবন যেন এমন না হয় তার জন্য কথা বলুন, প্রতিবাদ করুন।।।

লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা।

ছড়িয়ে দিনঃ